যেভাবে বের করা হয়েছিলো আলোর গতি!

বিজ্ঞান কে যারা ভালবাসেন তারা হয়তো নিশ্চয়ই জানেন আলোর গতি সম্পর্কে। অনেকেই আবার এটা ভেবে আবার অবাকও হবেন নিশ্চয়ই। গতি বলতে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের পর বস্তুর সরণ। তাহলে আলোর গতি কিভাবে থাকতে পারে? হ্যাঁ। আলোর গতি আছে। আমরা জানি আলো একপ্রকার শক্তি। যার গতি আছে। তহলে শুরু করি যেভাবে বের করা হয়েছিলো আলোর এই গতি।

গ্রীষ্মকালে যখন আকাশে অগ্নিশিখার মত সূর্য জ্বলজ্বল করে, তখন আমরা এর থেকে বাঁচার জন্য ছায়া খুঁজে বেড়াই। আবার শীতকালে যখন ঠান্ডায় হীম হয়ে যাই তখন একমুঠো রোদে রৌদ্রস্নান করার জন্য সেই আমরাই উম্মুখ হয়ে থাকি। তখন বাচ্চারা অনেকেই বলে উঠে সূর্যকে যদি বাতির মত সুইচ দিয়ে টিপে নিভানো যেতো তাহলে কি ভালটাই না হতো। তবে আমরা বাতিকে যেমন সুইচ দিয়ে টিপে নিভাতে পাড়ি, সূর্যকে তা পারতাম না। কারন এমন টা হলে পৃথিবী বাসির নিকট সময় লেগে যেত ৮ মিনিট। কারন পৃথিবীর যে পাশে সূর্য আলো ছড়ায় সে পাশে আলো নিভানোর পর আরও ৮ মিনিট ধরে সেই পাশটা আলোকিত থাকবে। ব্যাপারটা শুনে হয়তো বাচ্চারা অনেকেই ধাক্কা খেয়ে যাবে। কারন প্রতিদিনের জীবনে তো আমরা এমন কিছু ঘটতে দেখি নি। সুইচ টিপলেই আলো জ্বলে উঠে আর নিভালেই দুম করে আলো বন্ধ হয়ে যায়। একদম সাথে সাথেই তা ঘটে। ৮ মিনিট কেনো ১ সেকেন্ডও দেরী হয় না। তাহলে সূর্য কেন আমাদের সাথে ধোঁকাবাজী করবে। উত্তর টা একদম সহজ। কারন সূর্য থেকে পৃথিবীর যা দুরুত্ব তাতে পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। আরোর গতী অনেক কিন্তু অসীম না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আলোর সেই গতি প্রথমবার কে বের করেছিলো? আর কিভাবে বের করা হয়েছিল?

উত্তরটা দেওয়ার আগে একটা মজার কথা বলি, অনেককেই যখন প্রশ্ন করা হয় বলুন দেখি, আলোর গতি কোন শতাব্দীতে বের করা হয়েছিল? তারা অনেকেই মনে করে থাকেন এরকম জটিল প্রশ্নগুলোর আবিষ্কার হয়েছিলো গত শতাব্দীতেই। আর খুব বেশী হলে উনিশ শতকেই করা হয়েছিল এই প্রশ্নের সমাধান। আর সব থেকে মজার বিষয় হলো বয়ষ্করাও যখন তাদের জীবনের বেশি সময়টা পার করে এসে একই কথা বলে। যাই হোক এখন উত্তরটা দেই। এই প্রশ্নের সমাধান করা হয়েছিল সতের শতকে অর্থাৎ ১৬৭৬ সালে। চলুন তাহলে এবার আসল প্রশ্নের উত্তরটা দেই। কিভাবে বের করা হয়েছিল আলোর গতি? কোন জটিল হিসেবে না যেয়ে একটা গল্পের মাধ্যমে উত্তরটা দেওয়ার চেষ্টা করবো।

মহাবিশ্বের সবকিছুই মেনে চলে নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন। যেমন পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপর প্রদক্ষিন করতে সময় নেয় ২৪ ঘন্টা। যার কারনে ২৪ ঘন্টায় দিন ও রাত সংঘটিত হয়। যা কখনো ২২ ঘন্টা বা ২৬ ঘন্টা হয় না। প্রশ্ন জাগতে পারে পৃথিবীর কক্ষপথ কেমন বা এমন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানী নিউটন বেশ কিছু সূত্র ও তথ্য দিয়েছিলেন। যা দিয়ে অনেক ভাল করেই ব্যাখ্যা করা গেল মহাকর্ষ সম্পর্কে। নির্দিষ্ট ভারওয়ালা কোন বস্তু কোন নির্দিষ্ট ভারওয়ালা বস্তুর চারদিকে চারপাশে কিভাবে, কত গতিতে এবং কত সময় ধরে ঘুরবে এগুলো আগের থেকে অনেক সুক্ষ্নভাবে নির্ণয় করা গেলো।

পরীশেষে সমস্যা থেকেই গেল বৃহস্পতির চাঁদকে নিয়ে। পরিষ্কার করে বলতে গেলে চাঁদের একাধিক কক্ষপথকে নিয়ে। বিজ্ঞানী নিউটন যে হিসেব দেন তাতে, চাঁদগুলো বৃহষ্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরার নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবী থেকে চাঁদকে নির্দিষ্ট জায়গায় দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবিক সেরকম ঘটনা ঘটছেচ না। কোন কোন সময় একদম সময় মত দেখা যায় চাঁদকে আবার কোন সময় ৮ মিনিট পরে দেখা যায় আবার কোন সময় দেখা যায় ৮ মিনিট আগেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে বিজ্ঞানী নিউটন কি কোন ভূল করলো?

ডেনমার্কের জ্যোতির্বিদ ওলে রয়মার (Ole Rømer) ১৬৭৬ সালে অনুধাবন করতে পারলেন মতবাদটিতে আরও একটি তথ্য যোগ করা দরকার। নির্ধারিত সময়ের আগে যখন চাঁদকে দেখা যায়, তখন বৃহঃষ্পতি ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবরি কাছে চলে আসে। আবার যখন নির্ধারিত সময়ের পরে চাঁদকে দেখা যায়, তখন বৃহষ্পতি পৃথিবী থেকে অনেক দুরে অবস্তান করে। তিনি আসল পর্যবেক্ষনটা করেছিলেন বৃহস্পতি এর চাঁদের একটা ইয়ো (IO)- চন্দ্রগ্রহন নিয়ে। সে সময় তিনি অদ্ভুত রকমের একটা দাবী করে বসলেন- যেখানে চাঁদের এই ঘটনাটা ঘটে সেখান থেকে ঘটনাটা পৃথিবীতে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। কত দুরে থাকলে কত সময় লাগে সেই হিসেব প্রকাশ করে তিনি তখনকার যুগের মানুষের চোখ উপরে তুলে দেওয়ার মত একটা প্রস্তাব রেখেছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল- আলোর গতি অসীম না। আলোরও নির্দিষ্ট একটা গতি আছে। আর তা হল প্রতি সেকেন্ডে আলো ২ লাখ ২০ হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করে। (আসল গতিটা হলো প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ্য কিলোমিটার) ওনার গতি উপস্থাপন টা আসল গতির থেকে ২৬% কম প্রমান হয়। তাহলে কি তিনি হিসেবে ভূল করেছিলেন? না ভূল করেন নি। আসলে তখন যে যন্ত্রপাতি ছিলো তা দিয়ে তিনি যতটুকু হিসেব করতে পেরেছিলেন উনি সেটাই করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে অত্যাধুনিক যন্ত্র বেড়েছে। যন্ত্রের সংবেদনশীলতা বেড়েছে এবং আরও নিখুঁত হয়েছে আর আমরাও পেয়েছি আলোর বেগের সুক্ষ্ন হিসেব।

বিজ্ঞানী ওলে রয়মার জন্মগ্রহন করেন ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে। তার জন্ম হয় ১৬৪৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। তিনি অধুনিক থার্মোমিটার আবিষ্কার করেন। তার বানানে রয়মার স্কেলকে আরও উন্নত করে ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট পরবর্তীতে আবিষ্কার করেন ফারেনহাইট স্কেল। আপনারা হয়তো কমিকস বই “ফ্লাশ” পড়ে থাকবেন বা দেখে থাকবেন। সেখানে ফ্লাশ অনেক জোড়ে দৌড়ায় এবং বেশ কয়েকবার সে নিজের গতিবেগ মেপেছে রয়মার ইউনিট দিয়ে। আর তা বিজ্ঞানী ওলে রয়মারের স্মরনেই।

Facebook Comments
" data-link="https://twitter.com/intent/tweet?text=%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87+%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B0+%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE+%E0%A6%B9%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%8B+%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%B0+%E0%A6%97%E0%A6%A4%E0%A6%BF%21&url=https%3A%2F%2Fshikhunbd.com%2FPost%2F563&via=">">Tweet
36 Shares

আরও দেখুন