ফরজ গোসলের শর্ত ও নিয়ম সমূহ

আমরা সকলেই জানি বিভিন্ন কারনে গোসল ফরজ হয়ে থাকে। ফরজ গোসল আদায় করা ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারো উপর গোসল ফরজ হলে সঠিক ও শুদ্ধ পদ্ধতিতে ফরজ গোসল আদায় না করা অবধি সেই ব্যাক্তি নাপাক থাকেন। আর কেউ যদি নাপাক অবস্থায় থাকেন এবং কোন ইবাদাত আদায় করেন তা কখনো কবুল হবে না। সুতরাং শারীরিক পবিত্রতা অর্জন করা এবং নিজেকে ইবাদাতের জন্য প্রস্তুত রাখাই ফরজ গোসলের কারন। মনে রাখবেন মোমিন ব্যাক্তির সকল কাজই ইবাদাতের শামীল। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই গোসল ফরজ হলে তা আদায় করা উচিৎ। নিম্নে গোসল ফরজ হওয়ার কারণ সমূহ উল্লেখ করা হলো-

  • ১। জাগ্রত অবস্থা বা ঘুমের মধ্যে উত্তেজনার বসে বীর্যপাত করা। তবে ঘুমের মধ্যে উত্তেজনা না হয়েও যদি বীর্যপাত হয় তবুও গোসল ফরজ হয়ে যায়। কেন না ঘুমের মধ্যে কারো স্বপ্নদোষ হলে অনেকেই তা বুঝতে পারে না। সুতরাং বীর্যপাত হলেই ফরজ গোসল আদায় করতে হবে। সেখানে উত্তেজনা থাকুক আর না থাকুক এটা কোন বিষয় না।
  • ২। স্ত্রী সহবাস করলেই গোসল ফরজ হয়ে যায়। সহবাসের সময় স্ত্রীর যৌনাঙ্গে পুরুষাঙ্গের আগাটুকু ( কলি) প্রবেশ করলেই গোসল ফরজ হয়ে যায়। কেননা এ বিষয়ে নবী করিম (সঃ) বলেছেন, পানি নির্গত হলেই পানি ঢালতে হবে। [মুসলিম, অধ্যায় : হায়েজ, অনুচ্ছেদ হা/ ৩৪৩।] তিনি আরো বলেন স্ত্রীর চার শাখার দুই হাত অথবা দুই পায়ের মাঝে বসে সহবাস করলেই গোসল ফরজ হয়। [বুখারি, অধ্যায় : গোসল, অনুচ্ছেদ : হা/ ২৯১]। এখানে বীর্যপাতের কোন কথা বলা হয় নি। সুতরাং এর দ্বাড়া বুঝা যায় বীর্যপাত হোক আর না হোক স্ত্রী সহবাস করলেই গোসল ফরজ হবে। এ ব্যাপারে অনেক মানুষই জানেন না। তাই অনেকেই মনে করেন বীর্যপাত যেহুতু হয় নি যার কারনে গোসল না করেই কয়েকদিন কাটিয়ে দেন। এটি মারাত্নক বড় ভূল কাজ। আল্লাহ আমাদের এমন কাজ থেকে দূরে রাখেন যেন। উপরের তথ্য অনুযায়ী বলা যায় সহবাসের ফলে বীর্যপাত হোক বা না হোক স্বামী স্ত্রীর উভয়েরই গোসল ফরজ হয়।
  • ৩। নারীদের ঋতু (হায়েজ বা মিনস) এবং নেফাস ( সন্তান প্রসবের পর স্রাব) হলে গোসল ফরজ হয়। ঋতু সময় শেষ হলে কোন নারীকে ফরজ গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। কেননা মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- “তোমার কাছে জিজ্ঞেস করবে হায়েজ সম্পর্কে, বলে দাও এটা পবিত্র নয়। আর তোমরা হায়েজ কালীন সময়ে স্ত্রী সঙ্গম থেকে বিরত থাক। তখন পর্যন্ত বিরত থাক যতক্ষন না তারা পবিত্রতা অর্জন করে। আর যখন উত্তম ভাবে পবিত্র হবে তখন গমন করো তাদের কাছে। যেভাবে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের পছন্দ করেন” [সূরা বাক্বারা- ২২২] । নবী করিম (সঃ) ইস্তেহাজা বিশিষ্ট নারীকে নির্দেশ দিয়েছেন- ঋতু চলাকালিন দিন সমূহ সে বিরত থাকবে অতপর গোসল করবে। নেফাস হতে পবিত্র হওয়ার বিধানও একইরুপ।
  • ৪। অনেকেই আবার মনে করে থাকেন মৃত ব্যাক্তিকে গোসল করানো ফরজ। এই কথার দলিল হিসেবে মনে করা হয় নবী করিম (স) এর কন্যা জয়নাব মারা যাওয়ার পর যারা গোসল করাচ্ছিলেন যারা তাদের তিনি নির্দেশ দিলেন- জয়নাবকে তিনবার গোসল করাতে, বা পাঁচবার বা সাত বার বা তারও অধীক তোমরা যদি তা মনে কর। [বুখারি, অধ্যায় : জানাযা, অনুচ্ছেদ : মৃতকে পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল দেয়া ও অজু করানো। হা/১২৫৩। মুসলিম, অধ্যায় : জানাযা, অনুচ্ছেদ : মৃতকে গোসল দেয়া, হা/৯৩৯।] অন্য এক হাদীসে আছে- বিদায় হজ্বের দিনে এক ব্যাক্তি ইহরাম বাধা অবস্থায় আসন থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যূবরণ করেন। এবং তখন রাসূল (সঃ) বলেন তাকে পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল দিতে এবং দুই কাপরে কাফন পরাতে। [বুখারি, অধ্যায় : জানাযা, অনুচ্ছেদ : ইহরামকারী মৃত ব্যক্তিকে কিভাবে কাফন পরাতে হয়। হা/ ১২৬৭। মুসলিম, অধ্যায় : হজ, অনুচ্ছেদ : ইহরামকারী মৃত্যুবরণ করলে কি করতে হবে। হা/১২০৬] মৃত্যূ ব্যক্তিকে গোসল করানো ফরজ তবে তা জীবিত ব্যক্তিদের উপর। কারন মারা যাওয়ার পর উক্ত ব্যক্তির সকল বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে গেছে। তাই জীবিত ব্যক্তিদের ফরজ হচ্ছে তাকে গোসল করিয়ে দাফন করানো।

গোসলের ফরজ সমূহঃ

গোসলের মোট ফরজ ৩ টি। এই তিনটির কোন একটি বাদ পড়লে ফরজ গোসল আদায় হবে না। এজন্য ফরজ গোসল আদায় করার সময় উক্ত বিষয় তিনটি খুবই সতর্কতার সাথে করা জরুরী।

  • ১। দুই হাতের কব্জি অবধি ভালভাবে ধোয়া।
  • ২। গড়গড়া সহ কুলি করা।
  • ৩। নাকের নরম স্থান পর্যন্ত পানি পৌঁছানো।

ফরজ গোসলের সুন্নত সমূহঃ

  • ১। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে গোসলের নিয়ত করা।
  • ২। ফরজ গোসল গুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
  • ৩। প্রথমে অজু করা।
  • ৪। শরীরে কোন নাপাকি থাকলে দুর করা।
  • ৫। মেছওয়াক করা।
  • ৬। সারা দেহে পানি ঢালা।

বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে-

  • ১। ফরজ গোসল আদায় করার সময় পুরুষের দাড়ি ও মাথার চুল এবং মহিলাদের জন্য মাথার চুল অবশ্যই ভালভাবে ভিজতে হবে।
  • ২। এই নিয়মে গোসলের পর যদি অজু না ভাঙ্গে তবে নতুন করে আর অজুর প্রয়োজন নেই।

মূল : মুফতি শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন (রহ.) ভাষান্তর : মাওলানা মিরাজ রহমান

Facebook Comments

পোষ্টটি আপনার কত ভালো লেগেছে?

তারকা চিহ্নে ক্লিক করুন

রেটিং গড়ঃ / 5. ভোট সংখ্যাঃ

As you found this post useful...

Follow us on social media!

We are sorry that this post was not useful for you!

Let us improve this post!

আরও দেখুন